৫বছর ধরে নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ, জেলে পরিবারে দুর্দিন

0 ৮৮

গোলাম আজম খান,

নাফনদী হয়ে রোহিঙ্গা ঢল ও ইয়াবা পাচারের অজুহাতে মাছ শিকারে ২০১৭ সালে স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় টানা ৫ বছর ধরে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে।এরপর থেকেই নাফনদী নির্ভর ১০ হাজার জেলে পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে জেলেদের।
মিয়ানমার-বাংলাদেশ ভাগ করা সীমান্তের ৬৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য আর ১ হাজার ৩৬৪ মিটার গড় প্রস্থের নাফনদী। কক্সবাজারের উখিয়া বালুখালী থেকে  টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ পর্যন্ত এ নদের দু্পই পারের মানুষের জীবন-জীবিকা ছিল মাছ ধরা। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢল ও ইয়াবা পাচারের অজুহাতে ও মাছ ধরা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।

সুত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট এই নদী দিয়ে সাড়ে ৯লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অনুপ্রবেশ করেছিল । ঠিক তার পাঁচ দিন পর ৩০ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দুই মাস নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার রোধে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। কিন্তু এ ঘোষণার পাঁচ বছর পরও মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা রয়ে গেছে। নাফ নদ দিয়ে মাদক পাচারের ভয়াবহতা দেখা যায় জেলা পুলিশের এক পরিসংখ্যানেও। ২০২২ সালে এক বছরে এ নদ দিয়ে পাচার হয়ে আসা ৯০০ কোটি টাকার বেশি ইয়াবা ও আইস উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানে ২ হাজার ৩১০টি মামলায় মোট ৩ হাজার ৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে টেকনাফে ২৮৫ কোটি টাকার মাদক, স্বর্ণ ও বিভিন্ন চোরাই পণ্য জব্দ হয়েছে।

অপরদিকে স্থানীয় জেলেরা পড়ছে বিপাকে। নাফনদীর নির্ভরশীল সিরাজুল ইসলাম বলেন, নাফ নদীর কিনারায় বসতি হওয়ায় বাপ-দাদার আমল হতেই আমাদের পরিবার মাছ শিকার করেই সংসার চালিয়ে এসেছি। নাফ নদীতে সব সময় পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায়। তাই মাছ শিকার ছাড়া অন্য কোনো পেশায় অভ্যস্ত হয়নি। এখনও নতুন পেশায় অভ্যস্ত হতে না পেরে বিগত ছয়টি বছর আমাদের মতো শত শত জেলে পরিবার মানবেতর জীবন পার করছে। নাফ নদীর তীর ঘেঁষে থাকা অর্ধসহস্রাধিক পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকার নাফ নদীতে মাছ শিকারের সুযোগ দিক।

আরেক জেলে আব্দুল হালিম বলেন, রোহিঙ্গাদের কথা সবাই চিন্তা করে কিন্তু আমাদের কথা চিন্তা করার কেউ নেই। ইয়াবার অজুহাতে নাফ নদীতে মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল কিন্তু এখনও কি ইয়াবা বন্ধ হয়েছে। উল্টো আরও বেড়েছে।

কমিল উল্লাহ নামে এক মাঝি বলেন, প্রায় ৫বছর ধরে মাছ শিকার বন্ধ। তার মধ্যে তেমন সরকারি সহায়তাও পাইনি। এতোদিন আমরা কীভাবে চলছি সেটার খবর কেউ রাখেনি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও বন্ধ। ঠিকমতো ছেলেমেয়েদের মুখে খাবারও দিতে পারি না। এক বেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। কোরবানির ঈদ ছাড়া চোখে মাংস দেখি না। যদি সরকার নাফ নদীতে মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয় তাহলে আমাদের মৃত্যু ছাড়া আর কিছু করার নেই।

টেকনাফ উপজেলা হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলী বলেন, যে কারণে মাছ ধরা বন্ধ করা হয়েছিল সেই ইয়াবা পাচার এখনও বন্ধ হয়নি নাফ নদীতে। তাহলে কেন টেকনাফের ১০ হাজার জেলে না খেয়ে থাকবে? দ্রুত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

টেকনাফ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে আড়াই হাজারের মতো। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার বন্ধে নাফ নদে মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই দুই মাসের আদেশে পরে সময় বাড়ানো হয়েছে কি না, কেউ জানে না। এখনও মাছ ধরা বন্ধ।’

টেকনাফের ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শেখ খালিদ মোহাম্মদ ইফতেখার বলেন, ‘নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। মৎস্যজীবীদের পুনর্বাসনের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের।’

জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমি টেকনাফে আসার আগে থেকেই নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। কত দিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল দেখতে হবে। দুই মাসের হলে কেন এখনও চালু হয়নি, তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

জেলেদের দাবি, নাফ নদীতে নিষেধাজ্ঞার ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ১০ হাজার জেলের একবারও খোঁজখবর নেয়নি কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান রাষ্ট্রের কাছে উপেক্ষিত থাকা জেলে সম্প্রদায়।

রিপ্লাই করুন

Your email address will not be published.